রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমের কবিতা সমগ্র | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কিছু প্রেম কবিতা





সুন্দর তুমি এসেছিলে


সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে
    অরুণ-বরণ পারিজাত লয়ে হাতে।
নিদ্রিত পুরী, পথিক ছিল না পথে,
একা চলি গেলে তোমার সোনার রথে,
বারেক থামিয়া মোর বাতায়নপানে,
  চেয়েছিলে তব করুণ নয়নপাতে।

সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে
       
 স্বপন আমার ভরেছিল কোন্‌ গন্ধে
     ঘরের আঁধার কেঁপেছিল কী আনন্দে,
 ধুলায় লুটানো নীরব আমার বীণা
     বেজে উঠেছিল অনাহত কী আঘাতে 
 কতবার আমি ভেবেছিনু উঠি-উঠি
      আলস ত্যজিয়া পথে বাহিরাই ছুটি
  উঠিনু যখন তখন গিয়েছ চলে--
      দেখা বুঝি আর হল না তোমার সাথে।

     সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ




নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে


নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
    রয়েছ নয়নে নয়নে,
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে
     হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।

বাসনা বসে মন অবিরত,
    ধায় দশ দিশে পাগলের মতো।
স্থির আঁখি তুমি ক্ষরণে শতত
    জাগিছ শয়নে স্বপনে।

সবাই ছেড়েছে নাই যার কেহ
   তুমি আছ তার আছে তব কেহ
নিরাশ্রয় জন পথ যার যেও
   সেও আছে তব ভবনে।

তুমি ছাড়া কেহ সাথি নাই আর
    সমুখে অনন্ত জীবন বিস্তার,
কাল পারাপার করিতেছ পার
    কেহ নাহি জানে কেমনে।

জানি শুধু তুমি আছ তাই আছি
      তুমি প্রাণময় তাই আমি বাঁচি,
যতো পাই তোমায় আরো ততো যাচি
     যতো জানি ততো জানি নে।

জানি আমি তোমায় পাবো নিরন্তন
     লোক লোকান্তরে যুগ যুগান্তর
তুমি আর আমি, মাঝে কেহ নাই
     কোনো বাঁধা নাই ভুবনে।
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
       রয়েছ নয়নে নয়নে


প্রথম চুম্বন


স্তব্ধ হল দশ দিক নত করি আঁখি-
       বন্ধ করি দিল গান যত ছিল পাখি।
শান্ত হয়ে গেল বায়ু, জলকলস্বর
      মুহূর্তে থামিয়া গেল, বনের মর্মর
বনের মর্মের মাঝে মিলাইল ধীরে।
      নিস্তরঙ্গ তটিনীর জনশূন্য তীরে
নিঃশব্দে নামিল আসি সায়াহ্নচ্ছায়ায়
      নিস্তব্ধ গগনপ্রান্ত নির্বাক্ ধরায়।
সেইক্ষণে বাতায়নে নীরব নির্জন
      আমাদের দুজনের প্রথম চুম্বন।
দিক্-দিগন্তরে বাজি উঠিল তখনি
      দেবালয়ে আরতির শঙ্খঘণ্টাধ্বনি।
অনন্ত নক্ষত্রলোক উঠিল শিহরি,
     আমাদের চক্ষে এল অশ্রুজল ভরি।

মিলন


আমি কেমন করিয়া জানাব আমার
      জুড়ালো হৃদয় জুড়ালো — আমার
জুড়ালো হৃদয় প্রভাতে।
     আমি কেমন করিয়া জানাব আমার
পরান কী নিধি কুড়ালো — ডুবিয়া
     নিবিড় নীরব শোভাতে।
আজ গিয়েছি সবার মাঝারে, সেথায়
     দেখেছি একেলা আলোকে — দেখেছি
আমার হৃদয়-রাজারে।
     আমি দু-একটি কথা কয়েছি তা-সনে
সে নীরব সভা-মাঝারে — দেখেছি
     চিরজনমের রাজারে।

ওগো, সে কি মোরে শুধু দেখেছিল চেয়ে
     অথবা জুড়ালো পরশে — তাহার
কমলকরের পরশে —
     আমি সে কথা সকলি গিয়েছি যে ভুলে
ভুলেছি পরম হরষে।
     আমি জানি না কী হল, শুধু এই জানি
চোখে মোর সুখ মাখালো — কে যেন
     সুখ-অঞ্জন মাখালো —
কার আঁখিভরা হাসি উঠিল প্রকাশি
     যে দিকেই আঁখি তাকালো।

আজ মনে হল কারে পেয়েছি — কারে যে
     পেয়েছি সে কথা জানি না।
আজ কী লাগি উঠিছে কাঁপিয়া কাঁপিয়া
     সারা আকাশের আঙিনা — কিসে যে
পুরেছে শূন্য জানি না।
     এই বাতাস আমারে হৃদয়ে লয়েছে,
আলোক আমার তনুতে — কেমনে
     মিলে গেছে মোর তনুতে।
তাই এ গগনভরা প্রভাত পশিল
     আমার অণুতে অণুতে।
আজ ত্রিভুবন-জোড়া কাহার বক্ষে
     দেহ মন মোর ফুরালো — যেন রে
নিঃশেষে আজি ফুরালো।
     আজ যেখানে যা হেরি সকলেরি মাঝে
জুড়ালো জীবন জুড়ালো — আমার
     আদি ও অন্ত জুড়ালো।

হঠাৎ দেখা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
     রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন।
     আগে ওকে বারবার দেখেছি
লালরঙের শাড়িতে
     দালিম ফুলের মতো রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
     আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে।
     মনে হল, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,
     যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে।

থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা;
     চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।
হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে
     আমাকে করলে নমস্কার।
সমাজবিধির পথ গেল খুলে,
     আলাপ করলেম শুরু –
কেমন আছ, কেমন চলছে সংসার
     ইত্যাদি।


সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে
     যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে।
দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব,
     কোনোটা বা দিলেই না।
বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় –
     কেন এ-সব কথা,
এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা।

     আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে
ওর সাথিদের সঙ্গে।
     এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে।
মনে হল কম সাহস নয়;
     বসলুম ওর এক-বেঞ্চিতে।
গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
     বললে মৃদুস্বরে,
কিছু মনে কোরো না, 
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
     দূরে যাবে তুমি,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
     তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে,
শুনব তোমার মুখে।
     সত্য করে বলবে তো?
আমি বললেম, বলব।
     বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,
আমাদের গেছে যে দিন
     একেবারেই কি গেছে,
কিছুই কি নেই বাকি।

একটুকু রইলেম চুপ করে;
      তারপর বললেম,
রাতের সব তারাই আছে
      দিনের আলোর গভীরে।
খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম না কি।
      ও বললে, থাক্‌, এখন যাও ও দিকে।
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে;
     আমি চললেম একা।


আহা আজি এই বসন্তে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,
     এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়,
সখীর হৃদয় কুসুম কোমল –
     কার অনাদরে আজি ঝরে যায়!
কেন কাছে আস, কেন মিছে হাস,
     কাছে যে আসিত সে তো আসিতে না চায়।
সুখে আছে যারা, সুখে থাক তারা,
     সুখের বসন্ত সুখে হোক সারা –
দুখিনী নারীর নয়নের নীর
     সুখী জনে যেন দেখিতে না পায়।
তারা দেখেও দেখে না, তারা বুঝেও বুঝে না,
     তারা ফিরেও না চায়।

আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
     আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু,
নয় তো হীনবল-
     শুধু কি এ ব্যাকুল হয়ে
ফেলবে অশ্রুজল।
     মন্দমধুর সুখে শোভায়
প্রেম কে কেন ঘুমে ডোবায়।
      তোমার সাথে জাগতে সে চায়
আনন্দে পাগল।

নাচ যখন ভীষণ সাজে
     তীব্র তালের আঘাত বাজে,
পালায় ত্রাসে পালায় লাজে
     সন্দেহ বিহবল।
সেই প্রচন্ড মনোহরে
     প্রেম যেন মোর বরণ করে,
ক্ষুদ্র আশার স্বর্গ তাহার
     দিক সে রসাতল।

শেষের কবিতা


কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
     তারি রথ নিত্যই উধাও 
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয় স্পন্দন
     চক্রপিষ্ট আধারের বক্ষ ফাটা তারার ক্রন্দন। 
ওগো বন্ধু, 
     সেই ভাবমান কাল 
জড়ায় ধরিল মোরে ফেলি তার জাল --
     তুলে নিল দ্রুত রথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে 
     তোমা হতে বহুদূরে। 
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে 
     পার হয়ে আসিলাম 
আজি এ নবপ্রভাতের শিখর চূড়ায় 
     রথের চঞ্চল বেখাওয়ায় উড়ায় 
আমার পুরানো না।
     ফিরিবার পথ নাহি ;
দূর হতে যদি দেখো চাহি 
     পারিবে না চিনিতে আমায়। 
হে বন্ধু, বিদায়। 

কোনদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে 
     বসন্ত বাতাসে 
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস, 
     ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ, 
সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো-কিছু মোর পিছে রহিল সে 
      তোমার প্রাণের প্রান্তে ; বিস্মৃতি প্রদোষে 
হয়তো দিবে সে জ্যোতি 
     হয়তো ধরিবে কভু নাম হারা স্বপ্নের মুরতি। 
তবু সে তার স্বপ্ন নয়, 
     সবচেয়ে সত্য মোর,সেই মৃত্যুঞ্জয়, 
সে আমার প্রেম। 
     তারে আমি রাখিয়া এলেম 
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
     পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে 
কালের যাত্রায়। 
     হে বন্ধু, বিদায়। 
তোমার হয়নি কোন ক্ষতি। 
      মর্তের মৃত্তিকা মোর,তাই দিয়ে অমৃতমুরতি 
যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি 
     হোক তব সন্ধ্যা বেলা, 
পূজার সে খেলা 
       ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের স্নান স্পর্শ লেগে ;
তৃষ্ণার্ত আবেগ বেগে 
      ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোন ফুল নৈবেদ্যের থালে। 
তোমার মানস ভোজে সযত্নে সাজালে 
     যে ভাব রসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
যা মোর ধূলির ধন, যা মোট চক্ষের জলে ভিজে। 

আজো তুমি নিজে 
      হয়তোবা করিবে রচন 
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবৃষ্ট তোমার বচন। 
     ভাড় তার না রহিবে, না রহিবে দায়। 
হে বন্ধু, বিদায়। 

মোর লাগি করিও না শোক,
     আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক। 
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই 
      শূন্যেরে করিব পুর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই। 
উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষায় থাকে 
     সেই ধন্য করিবে আমাকে। 
শুক্লপক্ষ হতে আনি 
     রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
     অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায় 
     অসীম ক্ষমায় 
ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি, 
     এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি। 
তোমারে যা দিয়েছিনু তার 
     পেয়েছো নিঃশেষ অধিকার। 
হেথা মোর তিলে তিলে দান, 
     করুণ মুহূর্ত গুলি গন্ডুষ ভরিয়া করে পান 
হৃদয় অঞ্জলি হতে মম। 
     ওগো তুমি নিরুপম, 
হে ঐশ্বর্যবান, 
      তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান 
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায় 
      হে বন্ধু, বিদায় 

বন্যা

ব্যালাব্রুয়ি,বাঙ্গালোর 
২৮ জুন ১৯২৮


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url